বারবার সাসপেন্ড ও প্রত্যাহার হয়েও বিচার হয়নি, তাই তিনি এত বেপরোয়া

সিটিজি ভয়েস টিভি ডেস্ক:

প্রদীপ কুমার দাশ চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানার ওসি থাকাকালে ২০১৫ সালে এক শীর্ষ শিল্পপতির বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মিথ্যা মামলা করেন। সেই ব্যবসায়ী বিষয়টি পুলিশের শীর্ষ মহলকে অবহিত করলে তদন্তে মিথ্যা মামলার সত্যতা পাওয়ায় প্রদীপকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে সেই মামলার সত্যতা না পাওয়ার তথ্য জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশই।

শিল্পপতি সেলিম আহমেদকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানোয় প্রদীপকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও শাস্তি হয়নি তার। অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যান প্রদীপ।

প্রদীপের সহযোগী ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধেও আছে সাধারণ মানুষকে ফাঁসানোর অভিযোগ। লিয়াকত চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত থাকার সময় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনকে ক্রসফায়ার দেখানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। লিয়াকতের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেঁসেছেন শহীদ নামের এক শিক্ষার্থী ও রাসেল নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কথিত সোর্সের দেওয়া তথ্যে শহীদ ও রাসেলকে সাজানো ইয়াবা মামলায় লিয়াকত তাদের ফাঁসিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জসিম বলেন, ‘লিয়াকত আলী চট্টগ্রাম মহানগর ডিবিতে এসআই হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালের ১৪ জুন আমাকে ডেকে নিয়ে যান। সেখানে আটক করে মারধর করে মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেন।’

জসিম জানান, তখন ব্যবসায়িক পার্টনারদের সঙ্গে তার বিরোধ চলছিল। লিয়াকত তাকে ব্যসায়িক পার্টনারদের সঙ্গে সমঝোতার জন্য চাপ দেন। কিন্তু তিনি সমঝোতা না করায় তাকে আটক করে ভুয়া ওয়ারেন্ট দেখিয়ে পতেঙ্গা থানায় পাঠান। সেখানে ওয়ারেন্টটি ভুয়া দেখে তাকে ছেড়ে দেয় থানা পুলিশ। পরে রাস্তা থেকে ফের লিয়াকত তাকে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ারের ভয় দেখান।

নগরীর মুহুরীপাড়ার বাসিন্দা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রাসেলের কাছ থেকে ২০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে তাকেও মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে লিয়াকতের বিরুদ্ধে। মুহুরীপাড়ায় দোকান করার সময় স্থানীয় পুলিশের সোর্সের সঙ্গে রাসেলের মারামারি থেকে পূর্বশক্রতা ছিল। সোর্সকে খুশি করতে এ মামলা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রাসেল।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘ওসি প্রদীপ কুমার দাশ চাকরিজীবনের প্রায় পুরোটা সময় কাটিয়েছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলে। ঘুরেফিরে একই জায়গায় ছিলেন। মানুষকে হয়রানি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করার অভিযোগ উঠছে। তাই দুদক ও এনবিআর যেন প্রদীপের অবৈধ আয়ের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। তাহলে অন্যরা অপরাধ করার আগে চিন্তা করবেন। তিনি বলেন, পুলিশের শীর্ষ মহলের একটি অংশকে তারা ম্যানেজ করেই এসব অপকর্ম করে আসছিলেন। একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে ক্রসফায়ার নামের বিনাবিচারে মানুষ হত্যা বন্ধ হোক।’

চট্টগ্রামে পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ওসি প্রদীপ খুবই ক্ষমতাশালী ছিলেন। তিনি যেখানে যেতেন সেখানেই তার উপরের অফিসারদের পাত্তা দিতেন না। শীর্ষ মহলের সঙ্গে তার ভালো যোগাযোগ থাকায় তিনি একটু বেশিই বেপরোয়া ছিলেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে উঠতে থাকেন তিনি। ২০১৩ সালে পাঁচলাইশ থানার একটি মামলার বিরোধিতা করায় এক আইনজীবীকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ আছে প্রদীপের বিরুদ্ধে। পাঁচলাইশে ওসি থাকাকালে বাদুড়তলায় রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া বোরকা পরা এক বৃদ্ধাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে সমালোচিত হন প্রদীপ। সে ঘটনায় পাঁচলাইশ থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয় প্রদীপকে।

২০১২ সালে নগরীর পতেঙ্গা থানার দায়িত্ব পালনকালে আদালতের অনুমতি ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে আসা বিদেশি জাহাজকে তেল সরবরাহে বাধা দেওয়া, বার্জ আটক এবং বার্জ মালিকসহ ১২ ব্যক্তিকে মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তর গঠিত তদন্ত কমিটি প্রদীপকে অভিযুক্ত করলে পতেঙ্গা থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশে চাকরিকালেও নানা অপকর্মের জন্য আলোচনায় আসেন প্রদীপ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানায় এসআই থাকাকালে নগরীর পাথরঘাটার এক হিন্দু বিধবা মহিলার জমি দখলের অভিযোগ ওঠে প্রদীপের বিরুদ্ধে। প্রদীপের রোষানল থেকে রেহাই পায়নি তার নিজের পরিবারও। নগরের পাঁচলাইশ থানা এলাকায় নিজের বোনের জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পতেঙ্গা থানায় থাকার সময় তার স্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে দেশছাড়া করার অভিযোগ আছে। সর্বশেষ টেকনাফ থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কাউকে পাত্তাই দিতেন না প্রদীপ। ১৯৯৫ সালে চাকরিজীবন শুরু হয় তার।

সুত্রঃ সমকাল

মতামত