সিটিজি ভয়েস টিভি ডেস্ক
শীতের মৌসুমে চট্টগ্রাম সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রয় পাওয়া সমাজের এক সময়কার সুবিধাবঞ্চিত-বিপন্ন-ঝুঁকিতে থাকা-পথ শিশুদের নিয়ে সপ্তাহব্যাপী নানা আয়োজনে বাঙালিয়ানায় পিঠাপুলি উৎসব, শিশু বরণ, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট প্রতিযোগিতা, বৃক্ষরোপণ, দেয়ালিকা উন্মোচন, আলোচনা সভা, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরণ ও নিবাসী শিশুদের মাঝে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে।

১০ ফেব্রুয়ারি রোজ সোমবার বিকাল ৪:০০ ঘটিকায় অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমকে ফুল দিয়ে বরণ করেন কেন্দ্রের নিবাসী শিশুরা। অত:পর প্রধান অতিথি ফরিদা খানম আয়োজনে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং শিশুদের তৈরিকৃত ‘আলোকবর্তিকা’ শিরোনামে দেয়ালিকার ৮ম সংখ্যা উন্মোচন করেন। এর পরে ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট প্রতিযোগিতা ২০২৫ এর বালিকা শাখার সমাপনী ম্যাচ উপভোগ করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ।
বেলুন ও পায়রা উড্ডয়নের মধ্য দিয়ে বাঙালিয়ানায় পিঠাপুলি অনুষ্ঠানের সূচনা করেন জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। এরপর ফিতা কেটে আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, উপভোগ্য এবং জমজমাট পিঠাপুলির সমাহারে সজ্জিত পিঠাশালা পরিদর্শন করেন।

নতুন বছরের শুরুতে শীতের মৌসুমে কেন্দ্রের উন্মুক্ত মাঠে বাঙালীয়ানার এই পসরায় ঠাঁই পেয়েছে ডিসি পার্ক পিঠাশালা, হালদা নদী পিঠাশালা, চন্দ্রনাথ পাহাড় পিঠাশালা, ফয়েজ লেক পিঠাশালা, পতেঙ্গা বীচ পিঠাশালা এবং উদালিয়া চা-বাগান পিঠাশালা শিরোনামে ছয়টি পিঠাশালা যাতে গ্রাম বাংলার ৮৪ রকম বাহারী স্বাদের পিঠাপুলির সংযোগ ঘটানো হয়।
সুবিধাবঞ্চিত দুই শতাধিক শিশুর মিলনমেলায় শীতকালীন অপরাহ্নে অনিন্দ্য সুন্দর এ পিঠাপুলি উৎসবে দেখা মিলেছে ঐতিহ্যবাহী ভাপা পিঠা, ইলিশ ভাপা পিঠা, ডিমের পানতোয়া পিঠা, ডিম পেস্ট্রি পিঠা, ডনেট পিঠা, মোমো পিঠা, সুজির ফ্রাইজাম পিঠা, ভর্তা চিতই পিঠা, দুধ চিতই পিঠা, ডিম চিতই পিঠা, জামাই পিঠা, নারকেল পুলি পিঠা, ভাপা সুইসরোল পিঠা, গাজর টেস্টি পুলি পিঠা, দুধ পুলি পিঠা, খোলা জালি পিঠা, নুন গড়া পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা, ক্ষীর পাটিসাপটা পিঠা, মালাই পাটিসাপটা পিঠা, ছিটা পিঠা, পোয়া পিঠা, ফিরনি, সিরিঞ্জ পিঠা, ঝিকিমিকি পিঠা, সাবুদানার পাপড় পিঠা, আতিক্কা পিঠা, তেজপাতা পিঠা, মশকলা পিঠা, পাতা পিঠা, চুটকি পিঠা, ফুল পিঠা, শীমফুল পিঠা, গোলাপফুল পিঠা, শামুক পিঠা, বিস্কুট পিঠা, জাম পিঠা, পয়সা পিঠা, বিবিখানা পিঠা, ম্যারা পিঠা, গোটা পিঠা, লাচ্ছা সেমাই পিঠা, হৃদয় হরণ পিঠা, নবাব নন্দিনী পিঠা, কুলফি পিঠা, ডিমের পুডিং, পাকন পিঠা, জিলাপী পিঠা, চুই পিঠা, সুজির মালপোয়া পিঠা, সাবুর রসভরা পিঠা, সুজির রসভরা পিঠা, লবঙ্গ লতিকা পিঠা, ঝাল পুলি পিঠা, চালের রুটি দিয়ে হাঁসের মাংসের রেজালা, কলা পুলি পিঠা, সুজির বিস্কুট পিঠা, বিন্নি পাটিসাপটা পিঠা, ফ্লাওয়ার সমুচা পিঠা, ফিস ফিঙ্গার, ডেনিস কিমা পিঠা, চিকেন ফ্রাই, চিকেন স্যান্ডেউইচ, এগ স্যান্ডউইচ, চিকেন নাগেট, চিকেন বল, গোলাপ জাম, রস মালাই, সুন্দরী মিষ্টি কুমড়ার পিঠা, নারিকেল এর নাড়ু, গাজর এর পেস্টিং পুলি পিঠা, খেজুর গুড় এর পুলি পিঠা, চিরুনি পিঠা, সাবু দানার পায়েস, এলোকেশি পিঠা, ঝিনুক পিঠা, অন্থন পিঠা, ঝুঁড়ি ভাজা পিঠা, আলুর পরোটা, মনাক্কা এবং চিকেন জালি কাবাব ইত্যাদি।

আয়োজনের তৃতীয় পর্বে কেন্দ্রের মাঠ প্রাঙ্গনে মহামায়া লেক মঞ্চে শিশু বরণ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আয়োজনের শুরুতে উৎসবমুখর পরিবেশে ব্যতিক্রমী আমোজে কেন্দ্রে আশ্রয় পাওয়া সুবিধাবঞ্চিত নিবাসী শিশুদের ফুল দিয়ে বরণ করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।

উপপ্রকল্প পরিচালক জেসমিন আকতার এর নান্দনিক সঞ্চালনায় এবং হাটহাজারী উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ.বি.এম.মশিউজ্জামান এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হাটহাজারী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) লুৎফুন নাহার শারমীন, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সাদমান সহিদ, সুব্রত হাওলাদার, রুমানা পারভীন তানিয়া এবং ফারজানা রহমান মীম, হাটহাজারী উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মুজাহিদুল ইসলাম, হাটহাজারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার রোজিনা রহমান, হাটহাজারী উপজেলার সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার লতিকা সিদ্দিকা, হাটহাজারী উপজেলা একাডেমী সুপারভাইজার মো: মুসলিম উদ্দিন, হাটহাজারী ১নং ফরহাদাবাদ ইউনিয়ন এর প্যানেল চেয়ারম্যান মো: শফিউল আজম এবং ৬নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য আলী আকবর, ফরহাদাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো : মাহবুবুল আলম, ফরহাদাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান সহ আরও অনেকে।
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন- চট্টগ্রাম সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র আমাদেরই প্রতিষ্ঠান। এই শিশুরা নতুন বাংলাদেশের ভবিষৎ কর্ণধার। তিনি হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এর সকল কর্মকর্তাকে কেন্দ্রের যে কোন ধরণের সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে নিদের্শনা প্রদান করেন। অত:পর শিশুতোষ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা প্রধান অতিথিসহ উপস্থিত সকলকেই আবেগাপ্লুত করে তোলে।

অনুষ্ঠানের শেষভাগে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। এছাড়াও চট্টগ্রাম সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম কে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন কেন্দ্রের কর্মকর্তা -কর্মচারীবৃন্দ। তাঁবু জলসা ও বিশেষ নৈশভোজ দিয়ে শেষ হয় সপ্তাহব্যাপী বাঙালিয়ানায় পিঠাপুলি উৎসবের আয়োজন।
কেন্দ্রের উপপ্রকল্প পরিচালক জেসমিন আকতার জানান- মূলত নতুন বছর উপলক্ষে শীতের মৌসুমে কেন্দ্রের নিবাসী শিশুদের এক পশলা আনন্দের বৃষ্টি ঝরিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোঁটানোর জন্য আমাদের এই ছোট্ট প্রয়াস।

উৎসবমুখর পরিবেশে পিঠা ভোজনে শিশুরা সমস্বরে স্লোগান তোলে-
“শীত এলো তাই হিম হিম পড়ছে শিশির ঘাসে,
শীত এলো তাই সূর্য্যিমামা দেরী করে হাসে।
শীত এলো তাই সবাই মিলে পিঠাপুলি খাই,
উৎসবের আনন্দেতে একসাথে গান গাই।”
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়াধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত চট্টগ্রাম সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র ২০১২ খিস্টাব্দ থেকে সমাজের ঝুঁকিতে থাকা-বিপন্ন-পথ শিশুদের মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে সমন্বিত সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।