অবাধে চলছে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও লুটতরাজ
সিটিজি ভয়েস টিভি ডেস্ক:
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ১২ই মে সোমবার এই প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ।
আওয়ামী লীগকে প্রজ্ঞাপন জারি করে নিষিদ্ধ করা হলেও দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় আওয়ামী লীগের চাঁদাবাজ লুটপাটকারিদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও লুটতরাজ চালাচ্ছে বিএনপি’র কতিপয় নেতা। যারা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছেন তাদের মধ্যে বিএনপি’র শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেই থাকলেও এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিএনপির এই শীর্ষ নেতাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে আওয়ামী লীগের চিহ্নিত ক্যাডার দেশ জুড়ে ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করলেও দলের এসব নেতাদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
২০২৪ সালের ৫ ই আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সদলবলে বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়, আবার অনেকে আত্মগোপনে চলে যায়। তেমনিভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন নোয়াখালী-২ (সেনবাগ-সোনাইমুড়ি আংশিক) আসনের সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য মামুনর রশীদ কিরন এমপির ক্যাডার হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত সোনাইমুড়ী পৌর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম।
কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও পরবর্তীতে খোলস পাল্টে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের দিকে বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর ছত্রছায়ায় সোনাইমুড়ী উপজেলায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম। সোনাইমুড়ীতে সব ধরনের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও লুটতরাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এছাড়াও সোনাইমুড়ী উপজেলা জুড়ে মোটরসাইকেল শোডাউন দিয়ে আতংক ছড়াচ্ছে কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমসহ তাঁর ক্যাডাররা।
কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের হাতে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সোনাইমুড়ি উপজেলার বিহারী জনগোষ্ঠীরা। নিয়মিত হারে চাঁদা না পেলে মারধর, বাড়ি ঘর ভাঙচুর, দোকানপাট ভাঙচুর, দোকানের ক্যাশ বক্স থেকে টাকা লুট করা, মিথ্যা মামলার আসামি করে হয়রানি করাসহ অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের লোকজন।
এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল ১৫ই মে রোজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৭ টায় সোনাইমুড়ি পৌরসভার সোনাইমুড়ী বাজারে অবস্থিত বাঙালিয়ানা রেস্টুরেন্ট, ইনসাফ রেস্টুরেন্ট, চড়ুইভাতি রেস্টুরেন্ট, চেইন সুপার শপ স্বপ্ন, স্থানীয় আরেকটি সুপার শপ আয়েশা মার্টসহ ৮টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলাও ভাঙচুর চালিয়েছে কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের ক্যাডাররা।
প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের নামে ৫ লক্ষ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। চাঁদা না পেয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
স্বপ্ন সুপার স্বপ্ন এর পরিচালক কায়সার হামিদ বলেন আমাদের কাছে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা চাওয়ার পর না দেওয়াই আমাদের প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করা হয়েছে এবং আমাদের মারধর করা হয়েছে।
ইনসাফ রেস্তোরাঁর মালিক শাহাবুদ্দিন বলেন আওয়ামী লীগের আমলে ওদের নির্যাতনের কারণে ব্যবসা করতে পারিনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লা বুলুর ছত্রছায়ায় কাউন্সিলর জাহাঙ্গীরের লোকজন তাদের পুরনো নির্যাতন চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে।
চড়ুইভাতি রেস্টুরেন্ট এর পরিচালক বেগমগঞ্জ উপজেলার এখলাসপুর ইউপির ৩নং ওয়ার্ড এলাকার হাসেম মিয়ার বাড়ির আবুল হাসেমের ছেলে শহীদুল ইসলাম বলেন, কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আমাদের রেস্টুরেন্টের মালিক আমার বড় ভাই আবুল কাশেম দেশ ছেড়ে পালিয়ে কানাডায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। কানাডায় আশ্রয় নিয়েও তিনি কাউন্সিলর জাহাঙ্গীরের মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই পাননি প্রতিনিয়ত এসব মিথ্যা মামলার ওয়ারেন্ট নিয়ে আমাদের বাড়িতে পুলিশ এসে আমার বড় ভাইকে খুঁজছে।
শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের (১০ ডিসেম্বর) মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১০ টার সময় কাউন্সিলর জাহাগীর আলম তার দলবল নিয়ে আমাদের রেস্টুরেন্টে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবী করেন। চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ব্যাপক ভাংচুর চালায় এবং আমাকে বেধড়ক মারধর করে গুরুতর আহত করে।
এই ঘটনায় আমার পিতা আবুল হাসেম মিয়া বাদী হয়ে সোনাইমুড়ী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও পুলিশ কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের করা মিথ্যা মামলার ওয়ারেন্ট নিয়ে আমাদেরকে হয়রানি করেছ পুলিশ।
চড়ুইভাতি রেস্টুরেন্ট এর পরিচালক শহিদুল ইসলাম আরও বলেন, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ২০২১ সালে চাঁদা না পেয়ে আমার বড়ভাই আবুল কাশেমকেও পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করেছিল তাঁরা। তখন আমার বড়ভাই বাধ্য হয়ে রেস্টুরেন্টের দায়িত্ব আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে সিঙ্গাপুরে চলে যান। এরপর ২০২৩ আমার বড়ভাই আবুল কাশেম দেশে আসলে আরেক দফা হামলা চালায় কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের লোকজন। এসব হামলা মামলা সহ্য করতে না পেরে আমার বড়ভাই আবুল কাশেম পালিয়ে গিয়ে কানাডায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এরপরেও রেহাই মিলেনি ২০২৩ সালে মিথ্যা মামলার আসামী করা হয়েছে তাঁকে। এত কিছুর পরও তাদের হাত থেকে রেহাই মিলছেনা কিছুদিন পরপর তাঁরা মোটা অংকের চাঁদা দাবী করছে, চাঁদা না দিলে ভাংচুর ও মারধর করছে। জানিনা কখন ওদের হাত থেকে নিস্তার মিলবে? আমি এই বিষয়ে উপদেষ্টাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এবিষয়ে জানতে চাইলে সোনাইমুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন-অর-রশিদ বলেন, কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের লোকজন ৩টি রেস্টুরেন্ট সহ আটটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলাও ভাঙচুর চালিয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। আমরা এই বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।