সিটিজি ভয়েস টিভি ডেস্ক:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন ধরনের কিছু সন্ত্রাসী ও ক্যাডার থাকে তাদের ক্ষমতা কখনোই কমেনা বরং আরও বেড়ে যায়। কারণ হিসেবে দেখা যায় এলাকায় নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখতেই রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন এবং তাদের মাধ্যমেই চাঁদাবাজি ও দখলবাজি টিকিয়ে রেখে অবৈধ আয়ের কোটি কোটি টাকার ভাগ পেয়ে থাকেন।
ঠিক এই ধরনের ঘটনা ঘটছে নোয়াখালীতে।
নোয়াখালী জেলার ত্রাস হিসেবে পরিচিত বহুল আলোচিত সন্ত্রাসী সোনাইমুড়ী পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক এবং আওয়ামীলীগের সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য মামুনর রশীদ কিরন এমপির ক্যাডার হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি থেমে নেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সদলবলে বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়, আবার অনেকে আত্মগোপনে চলে যায়। তেমনিভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম। তবে তার সহযোগীরা সক্রিয় ছিল এবং জাহাঙ্গীর আড়াল থেকে সবকিছু পরিচালনা করছিল।
কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও পরবর্তীতে খোলস পাল্টে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের দিকে বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর ছত্রছায়ায় নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এবং সোনাইমুড়ী উপজেলায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম। নোয়াখালীর বালুমহাল, সড়ক ও পরিবহন খাত, বানিজ্যিক বিপনী বিতান, ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, রিয়েল এস্টেটসহ সবগুলো খাত থেকে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও লুটতরাজ চালানোর সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের হাতে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সংখ্যালঘু বিহারী জনগোষ্ঠীরা। আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে তাদের উপর যতটুকু নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হতো এখন সেটা আরও ২/৩ গুন বেশি করা হচ্ছে। অতিরিক্ত হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, চাহিদামত চাঁদা না পেলে মারধর, বাড়ি ঘর ভাঙচুর, দোকানপাট ভাঙচুর, দোকানের ক্যাশ বক্স থেকে টাকা লুট করা, মিথ্যা মামলার আসামি করে হয়রানি করাসহ অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের লোকজন।
কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার পরও রেহাই মিলছেনা অনেকের। যাঁরাই জাহাঙ্গীরের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তাদের উপর নেমে এসেছে মিথ্যা মামলা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ৩/৪ গুণ বেশি চাঁদা আদায়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে হামলা ভাংচুর চালানো এবং মারধরের মত নির্যাতন। তাদের নির্যাতন থেকে বাদ যাচ্ছেনা নারী ও শিশুরা, রাস্তাঘাটে শ্লীলতাহানির পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে অপহরণের হুমকি।
তেমনি একজন ভুক্তভোগী কানাডা প্রবাসী বিহারী আবুল কাশেম এর সাথে কথা বলেছেন আমাদের প্রতিবেদক সাংবাদিক আবদুল আউয়াল জনি। আবুল কাশেম নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার এখলাসপুর ইউপির ৩নং ওয়ার্ড এলাকার হাসেম মিয়ার বাড়ির বিহারী আবুল হাসেমের ছেলে।
তিনি বলেন, নির্যাতন-নিপীড়ন মামলা-হামলা সইতে না পেরে পালিয়ে কানাডায় আশ্রয় নিয়েছি। ভেবেছিলাম আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর কিছুটা নিরাপত্তা মিলবে, কিন্তু ঘটেছে এর উল্টো এখন মামলা-হামলা ও নির্যাতনের মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেড়েছে। নির্যাতন ও অপহরণের হুমকিতে ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে আমার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েরা। ছোটভাইয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চালানো হয়েছে দফায় দফায় হামলা ভাংচুর।
আবুল কাশেম অভিযোগ করে বলেন, ২০২৫ সালের গত ১৮ মার্চ তারিখে জাহাঙ্গীরের সহযোগী কবির আরও তিনজন সন্ত্রাসী নিয়ে আমার মালিকানার চড়ুইভাতি রেস্টুরেন্টে আসে এবং আমার ভাই শহিদুলের কাছে ৪ লাখ টাকা দাবি করে, যাতে তারা তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনি মামলা লড়তে পারে। সে আরও বলে এই টাকা কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর চেয়েছে। আমার ভাই জানায় এটি অনেক বড় অঙ্কের টাকা এবং আমরা আওয়ামী লীগের সমর্থক নই। এটি শুনে কবির ও তার লোকজন আমার ভাইকে মারধর করে। আমার ভাইকে চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়। আমার ভাই পুলিশের কাছেও সাহায্য চেয়েছিল, কিন্তু পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো আমার ভাইকে হয়রানি করেছে।
এদিকে, আমার ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পারি যে জাহাঙ্গীর লুকিয়ে থাকা থেকে বের হয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ ভুলুর অধীনে তার অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে এখন সে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে গেছে।
গত ২০২৫ সালের ১০ জুলাই তারিখে আমার স্ত্রী আমার মেয়েকে সাথে নিয়ে বাজার থেকে কিছু কেনাকাটা করে ফিরছিল। পথে কাউন্সিলর জাহাঙ্গীরের অনুসারী কবির দলবল নিয়ে তাদের থামিয়ে আমার অবস্থান জানতে চায়। আমার স্ত্রী তথ্য দিতে অস্বীকার করলে কবির তাকে অশালীনভাবে স্পর্শ করে এবং আমার মেয়েকে অপহরণের হুমকি দেয়। এরপর আমার স্ত্রী ভয়ে আমার সন্তানদের নিয়ে সিলেটে তার বোন মোমেনা আক্তারের বাসায় চলে যায়।
কাশেম বলেন, ভেবেছিলাম আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর কিছুটা নিরাপত্তা মিলবে, কিন্তু ঘটেছে এর উল্টো এখন মামলা-হামলা ও নির্যাতনের মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেড়েছে। জানিনা এসব থেকে কখনো নিস্তার পাবো কিনা?
আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ এসব বিষয়ে কেন আইনের আশ্রয় নেননি? এমন প্রশ্নের উত্তরে কানাডা প্রবাসী আবুল কাশেম বলেন, কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আওয়ামীলীগের আমলে যতটা ভয়ংকর ছিলো এখন কয়েকগুণ বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে কারণ সে এখন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী বরকত উল্লাহ বুলুর ছত্রছায়ায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় থাকলেও এখানে বুলু যা বলেন সেটাই আইন, পুলিশ আইন-আদালত, সবকিছুর মালিক যেন তাঁরা। কারণ আগামীতে নির্বাচন হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে এটাই অনেকটা নিশ্চিত তাই পুলিশ, প্রশাসন, তাদের কথায় উঠে এবং বসে। আমাদের বাঁচানোর জন্য মহান আল্লাহ ছাড়া কেউই নেই। জানিনা কখন ওদের হাত থেকে নিস্তার মিলবে?
কানাডা প্রবাসী আবুল কাশেমের এতসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম বলেন এগুলো সবগুলো মিথ্যা অভিযোগ। বিহারি কাশেম আমার বিরুদ্ধে আপনাদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিউজ প্রচার করতে চাচ্ছে এমনটা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, বিএনপি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল, বিএনপি গণমানুষের দল, সবাইকে নিয়েই আমাদের রাজনীতি করতে হবে। আপনার ছত্রছায়ায় কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মামলা-হামলার মাধ্যমে নোয়াখালীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে সর্বস্তরের মানুষ এমন অভিযোগ করছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন এসব মিথ্যা অভিযোগ। আমার কাছ থেকে সুযোগ সুবিধা আদায় করতে না পেরে তাঁরা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার কোন অনুসারী চাঁদাবাজি দখলবাজির সাথে যুক্ত নয়।